সৃজনশীল শিক্ষা কি
সময়ের চাহিদামত জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মানে সৃজনশীল শিক্ষা ও নতুন ধারার গুরুত্ব অপরিসীম। আলোকিত সমাজ গঠনে এই সৃজনশীল শিক্ষা আজ অতি প্রয়োজন। প্রযুক্তির ব্যবহার আজ এমন জায়গায় এসে পৌছেচে, শিক্ষাথীরা এগুলো দ্বারা এখন দারুণভাবে প্রভাবিত।অর্থ্যাৎ শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র বই পড়ে, স্কুলে বা শিক্ষকের কাছে যেয়েই শিখছেনা। বহি:র্জগত থেকেও তারা অনেক কিছু শিখছে। ফলে বর্তমানে তাদেরকে শ্রেণিকক্ষে ধরে রাখাটাও অনেক কষ্টের হয়ে দাড়িয়েছে শিক্ষকদের পক্ষে। তাদেরকে ক্লাসরুমে ধরে রাখতে হলে শিক্ষকদের আরো বেশি পড়াশোনা ও সৃজনশীল হতে হবে।
একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির সৃজনশীলতা গঠিত হয় তার চারপাশের অবস্থা ও উপাদান থেকে। কারো সৃজনশীলতা, ব্যক্তিত্ব বা মানসিক বিকাশ শূন্য থেকে হয় না। সৃজনশীলতা জোর করে শেখানোর বিষয় নয়। এটি লালন করতে হয় এবং উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে এটির পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে। যে শিক্ষা মুখস্থ বিদ্যা নয় এবং যে শিক্ষা শুধুমাত্র বিষয়বস্তু কী শুধু তা জানা নয়, সেটাই সৃজনশীল শিক্ষা।
১. পেনিক (Harvey Penick) 1992: সমস্যার প্রতি সংবেদনশীল হওয়া, ঘাটতি পূরণ করা, জ্ঞানের অমিল বা অসাম্যতার প্রতি সংবেদনশীল হওয়াকে বলেছেন সৃজনশীলতা। একটি শিশুর যদিও জন্মগত বা সহজাত সামর্থ্য আছে সৃজনশীল হওয়ার, তারপরেও বাবা-মা ও শিক্ষকদের ভূমিকা রয়েছে তাকে সৃজনশীল করা, তার মধ্যে সৃজনশীলতার বৈশিষ্ট্যাবলি লালন করানো এবং উন্নয়ন ঘটানোর।
২. ডিঙ্গলডাইন (Dingledine 2003): পারিবারিক সহায়তা, শিক্ষা উপকরনণর প্রাপ্তি এবং সামাজিক কিছু চাপ সৃজনশীলতা বিকাশের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।
৩. সানট্রাক (Santrock 2004): সৃজনশীলতা হচ্ছে বস্তু বা বিষয় সম্পর্কে নতুনভাবে চিন্তা করার সামর্থ্য, নতুনভাবে চিন্তা করে অস্বাভাবিক কিংবা এককভাবে কোনো সমস্যার সমাধান বের করা।
৫. টরেন্স ( Torrens 1998): সৃজনশীলতার চারটি উপাদান আছে- ফ্লুইড স্ট্রাকচার, ফ্লেক্সিবিলিটি, অরিজিনালিটি এবং ইকরপোরেট করার দক্ষতা।
৬. ওয়ালস (Wallace): সৃজনশীল পদ্ধতি চারটি ধাপের সমন্বয়ে গঠিত। যেমন- (১) প্রস্তুতি (২) ইনকিউবেশন (৩) ইল্যুমিনেশন এবং (৪) ভেরিফিকেশন। এখানে প্রথম ধাপে জোর দেওয়া হচ্ছে সমস্যার দিকে, দ্বিতীয় ধাপে জোর দেওয়া হচ্ছে সমস্যা ইন্টারনালাইজ করা এবং তৃতীয় ধাপে জোর দেওয়া হচ্ছে ভেতরকার দিকে (ইনসাইট) এবং নতুন ধারণা সৃষ্টি এবং চতুর্থ ধাপ হচ্ছে যাচাই করা, বিস্তৃতি ঘটানো এবং ধারণাটিকে যুক্তিপুর্ণ করা।
তাহলে উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, একজন সৃজনশীল ব্যক্তির কল্পনা ও বিশ্লেণন দক্ষতার মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য আছে। এই একই ধরনের সৃজনশীলতার বিষয় পাওয়া যায় ''প্রাগমেটিক মেথডে'' যেখানে বিভিন্ন ধরনের কৌশল ব্যবহার করে সৃজনশীলতা শেখানো হয়। অ্যালেক্স অসবর্ন তার বইতে এই "ব্রেইন স্টরমিং'' বিষয়টা উল্লেখ করেছেন।
শ্রেণিকক্ষে বা শ্রেণিকক্ষের বাইরে সৃজনশীল শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে আমাদের শিক্ষকদের। কারন শিক্ষকরাই মূল চালিকাশক্তি। এই ক্ষেত্রে পলিসি মেকার, অভিভাবক, প্রশাসক বা কমিটির পক্ষ থেকে তাদেরকে সহায়তা করতে হবে। শিক্ষাদানের পদ্ধতি হতে হবে কৌশলনির্ভর আর তা নাহলে বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখ কষ্টকর হয়ে পড়বে। ক্লসরুমে ছাত্র-ছাত্যীদের স্বাধীনতা দিতে হবে। নতুন কিছু করার সুযোগ ও সহযোগীতা করতে হবে তাদের আগ্রহ ধরে রাখার জন্য। প্রযুক্তিনির্ভর লেখাপড়া শিক্ষার্থীদের কে যে সৃজনশীলতার দিকে ধাবিত করছে একথা শিক্ষকদের বুঝতে হবে। প্রযুক্তি ছাড়াও আরো অনে বিষয় আছে যেগুলো সুজনশীলতার সাথে ওতপ্রভাবে জড়িত।যেমন: মূল্যায়ন, সংস্কৃতি, শিক্ষাক্রম, ব্যক্তিগত দক্ষতা, শিক্খ ও পারি পার্শ্বিক অবস্থা।
বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা "চামচ দিয়ে খাওয়ানোর মত" আবস্থা। সমস্ত প্রকার শীট, নোট বানিয়ে শিক্ষার্থীদের গেলানো হচ্ছে। এর ফলে তাদের ভিতর এক ধরনের অযোগ্যতা তৈরি হচ্ছে। পারনি (Parny) : বলেছেন, এই বিষয়টি সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে। যতযাই হোক বিদ্যালয় কিন্তু শিক্ষার্থীর সৃজনশীল বিকাশের অন্যতম জায়গা হিসেবে বিবেচিত। অত্যান্ত দক্ষতার সাথে সকল ধরনের শিক্ষর্থীর মাঝে সৃজনশীলতার চর্চা করা যায় এখানে। সৃজনশীলতার বিকাশে কোন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর এক্ষেত্রে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে।
বিভিন্ন দেশে সৃজনশীলতা
চীনে সৃজনশীলতা শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ভাবা হচ্ছে ২০০১ সাল থেকে। হংকংয়েও সৃজনশীলতাকে "উচ্চমাত্রার চিন্তন দক্ষতা" হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এখানে প্রাক-স্কুল, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় সৃজনশীলতার চর্চা ও উন্নয়নকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। জাপানেও সৃজনশীল শিক্ষার প্রচলন হয়েছে প্রায় দ্বিতীয় বিম্বযুদ্ধের পর থেকে। সিংগাপুরের শিক্ষামন্ত্রনালয়ের ওয়েব সাইটে লেখা আছে যে, তাদের যুবকেরা "সৃজনশীল ও কল্পনা বিলাসী" হোক। সিংগাপুরের প্রাইমারি শিক্ষায় সৃজনশীলতার বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেক দেশেই আবার সৃজনশীল শিক্ষাটা অবহেলিত। তবে উন্নত বিশ্ব মনে করে যে, দেশের সার্বিক উন্নতি নির্ভর করে সে দেশের তরুনরা কতটা সৃজনশীল হলো তার উপর। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে সৃজনশীলতার কোন বিকল্প নেই।
বিভিন্ন গবেষনায় দেখা যায় যে, পুরাতন ধ্যান-ধারনার শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করেন যেটা সৃজনশীলতার বিকাশে সমস্যা। যে শিক্ষক শিক্ষার্থীর ক্ষমতায়ন করেন তিনি সৃজনশীল শিক্ষক। তার হাত ধরেই সৃজনশীল শিক্ষার্থী তৈরি হবে সহজেই। ইননোভেটিভ বা সৃজনশীল শিক্ষক শিক্ষার্থীর মতামতকে মূল্যায়ন করেন এবং প্রাধান্য দেন। সে শিক্ষার্থীর স্বধীনতায় বিশ্বসী এবং সে অনুসারে শিক্ষা দেন। অ্যামাবইস এজন্যই গুরুত্ব দিয়েছেন সৃজনশীল পরিবেশের ওপর যেখানে শিক্ষার্থী উৎসাহ পাবে, ভালো পারফরমেন্সের জন্য পুরস্কার পাবে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা এক ধরনের মালিকানা অনুভব করবে এবং নিজেদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে ও তার সমাধান করবে।
সৃজনশীলতার জন্য আসলে প্রয়োজন সময়, প্রবাহ, ইন্টারঅ্যাকশন ও ঝুকি নেওয়া যেগুলোর কোনটিই গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা সমর্থন করে না। চলবে---
[মুস্তাফিজুর রহমান]
Excellent writing, brother.
ReplyDelete